নবম শ্রেণি: বাংলা, চিঠি – স্বামী বিবেকানন্দ, রচনাধর্মী দীর্ঘ প্রশ্ন মান – 5
অধ্যায় 10: চিঠি
(বর্ণনামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: 5)
নিচের প্রশ্নগুলির নির্দেশমতো বিস্তারিত উত্তর দাও:
1. “তোমাকে সর্বাগ্রে একটা কথা খোলাখুলি বলা দরকার।” – কথাটি কী? এই কথাটি খোলাখুলি বলার কারণ কী? (1+4=5)
উত্তর দেখো
কথাটি হলো: স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর শিষ্যা মিস নোবেলকে (ভগিনী নিবেদিতা) ভারতবর্ষের চরম দারিদ্র্য, অশিক্ষা, কুসংস্কার, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং এদেশের গ্রীষ্মপ্রধান রুক্ষ আবহাওয়ার রূঢ় বাস্তব চিত্রটি সম্পর্কে খোলাখুলি জানিয়েছিলেন।
খোলাখুলি বলার কারণ: মিস নোবেল ছিলেন একজন ইউরোপীয় নারী, যিনি পাশ্চাত্য সভ্যতার সমস্ত আরাম ও সুযোগ-সুবিধার মধ্যে বড়ো হয়েছেন। ভারতের নারীসমাজের উন্নয়নের জন্য তিনি নিজের দেশ ছেড়ে ভারতে আসতে চেয়েছিলেন। স্বামীজি জানতেন যে, দূর থেকে ভারতবর্ষকে যতটা আধ্যাত্মিক এবং সুন্দর মনে হয়, বাস্তবের ভারতবর্ষ ততটাই কঠিন এবং কুসংস্কারে আচ্ছন্ন। এদেশের সাধারণ মানুষ যেমন শ্বেতাঙ্গদের ভয় ও ঘৃণা করে, তেমনি ব্রিটিশরাও ভারতীয়দের তাচ্ছিল্য করে। এর ওপর গ্রীষ্মমণ্ডলের আবহাওয়া এবং শহরের নোংরা পরিবেশ পশ্চিমাদের কাছে অত্যন্ত অসহনীয়। মিস নোবেল যাতে এই চরম প্রতিকূলতার কথা না জেনে আবেগের বশে ভারতে এসে পরে হতাশ না হন, সেই কারণেই স্বামীজি একজন প্রকৃত গুরুর মতো তাঁকে আগে থেকেই সমস্ত বাধা এবং বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন করে দিতে চেয়েছিলেন।
2. “ভারতবর্ষের কাজে তোমার এক প্রকাণ্ড ভবিষ্যৎ রয়েছে।” – বক্তা কে? তাঁর এমন মনে করার কারণ কী? (1+4=5)
উত্তর দেখো
বক্তা: উদ্ধৃত উক্তিটির বক্তা হলেন স্বামী বিবেকানন্দ। তিনি তাঁর আইরিশ শিষ্যা মিস মার্গারেট নোবেলকে (ভগিনী নিবেদিতাকে) উদ্দেশ্য করে এই কথাটি বলেছেন।
এমন মনে করার কারণ: স্বামীজি তাঁর দূরদৃষ্টি দিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন যে, পরাধীন ভারতবর্ষের নারীসমাজের চরম দুর্দশা ঘোচানোর জন্য কোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে কাজ করা সম্ভব নয়। যুগ যুগ ধরে অশিক্ষা এবং দাসত্বের অন্ধকারে ডুবে থাকা ভারতীয় নারীদের জাগিয়ে তুলতে গেলে প্রয়োজন এমন এক নারীর, যাঁর মধ্যে প্রকৃত সিংহীর মতো অসীম সাহস এবং তেজ রয়েছে। স্বামীজি মিস নোবেলের মধ্যে সেই সমস্ত গুণাবলি দেখতে পেয়েছিলেন। মিস নোবেলের উচ্চশিক্ষা, কাজের প্রতি ঐকান্তিক নিষ্ঠা, চরিত্রের পবিত্রতা, এবং সর্বোপরি নিপীড়িত মানুষের প্রতি তাঁর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা স্বামীজিকে মুগ্ধ করেছিল। স্বামীজির দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, মিস নোবেলের এই মানসিক দৃঢ়তা এবং আত্মত্যাগের মনোভাব ভারতের নারীসমাজের কল্যাণে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে। তাই ভারতের নবজাগরণে মিস নোবেলের এই অপরিহার্য ভূমিকার কথা ভেবেই তিনি তাঁর প্রকাণ্ড ভবিষ্যতের কথা বলেছেন।
3. ‘চিঠি’ প্রবন্ধে স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর কয়েকজন পাশ্চাত্য শিষ্যা ও সহকর্মীর যে পরিচয় দিয়েছেন, তা নিজের ভাষায় লেখো। (5)
উত্তর দেখো
স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর ‘চিঠি’ প্রবন্ধে মিস নোবেলকে ভারতে আসার আগে এখানকার কাজের পরিবেশে যুক্ত থাকা কয়েকজন পাশ্চাত্য অনুগামী ও সহকর্মীর স্বভাব সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা দিয়েছেন:
ক) মিস মুলার: মিস মুলার সম্পর্কে স্বামীজি জানিয়েছেন যে, তিনি চমৎকার মহিলা হলেও তাঁর মেজাজ অত্যন্ত রুক্ষ এবং তিনি খুব অস্থিরচিত্ত। তিনি নিজেকে আজন্ম নেত্রী বলে মনে করেন এবং অর্থ দিয়ে জগৎ কিনতে চান। তাঁর এই খবরদারির মনোভাবের জন্য তাঁর সাথে কাজ করা অত্যন্ত কঠিন।
খ) মিস্টার স্টাডি: ই. টি. স্টাডি সম্পর্কে স্বামীজি জানিয়েছেন যে, কাজের প্রতি তাঁর আগের সেই প্রবল উৎসাহ এখন অনেক কমে গেছে।
গ) সেভিয়ার দম্পতি: ক্যাপ্টেন সেভিয়ার এবং মিসেস সেভিয়ারকে স্বামীজি তাঁর অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। তাঁরাই একমাত্র ইংরেজ যাঁরা ভারতীয়দের ঘৃণা করেন না। মিসেস সেভিয়ারকে স্বামীজি অত্যন্ত স্নেহময়ী ‘মাতা’ বলে উল্লেখ করেছেন, যাঁদের সাহায্য ছাড়া স্বামীজির কাজ সম্পূর্ণ হতো না।
ঘ) মিস ম্যাকলাউড ও মিসেস বুল: স্বামীজি এদের দুজনকে অত্যন্ত উপকারী বন্ধু বলে মনে করেছেন। শরৎকালে এঁদের ভারতে আসার সম্ভাবনা ছিল এবং এঁদের সঙ্গী হলে মিস নোবেলের ভারতযাত্রা অত্যন্ত নিরাপদ হবে বলে স্বামীজি জানিয়েছেন।
4. স্বামী বিবেকানন্দ ‘চিঠি’ প্রবন্ধে মিস নোবেলকে ভারতের কোন্ রূঢ় বাস্তব অবস্থার কথা জানিয়েছেন? (5)
উত্তর দেখো
স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর ‘চিঠি’ প্রবন্ধে দূর থেকে দেখা আধ্যাত্মিক ভারতবর্ষের বাইরের এক চরম রূঢ় ও বাস্তব ভারতবর্ষের চিত্র মিস নোবেলের সামনে তুলে ধরেছেন:
ক) দারিদ্র্য ও কুসংস্কার: স্বামীজি জানিয়েছেন যে ভারতের সাধারণ মানুষের দারিদ্র্য অবর্ণনীয়। তারা চরম অশিক্ষা এবং কুসংস্কারের অন্ধকারে ডুবে আছে, যা তাদের প্রগতির পথে সবচেয়ে বড়ো বাধা।
খ) দাসত্বসুলভ মানসিকতা ও ঘৃণা: পরাধীনতার কারণে এদেশের মানুষের মনে এক ক্রীতদাসসুলভ মানসিকতা তৈরি হয়েছে। তারা শ্বেতাঙ্গদের বা ইংরেজদের দেখলে যেমন ভয় পায়, তেমনি তাদের মনে মনে প্রবল ঘৃণাও করে। অন্যদিকে, শ্বেতাঙ্গরাও ভারতীয়দের অত্যন্ত তাচ্ছিল্য করে। এর ফলে ভারতবাসীদের হয়ে কাজ করতে গেলে শ্বেতাঙ্গরা মিস নোবেলকে এড়িয়ে চলবে।
গ) প্রতিকূল পরিবেশ ও জলবায়ু: ভারতের জলবায়ু ইংল্যান্ডের মতো শীতল নয়, এটি অত্যন্ত গ্রীষ্মপ্রধান এবং এখানকার শীতকালও পশ্চিমাদের কাছে গ্রীষ্মের মতোই। এর পাশাপাশি এদেশের শহরগুলি ইউরোপের মতো পরিষ্কার নয়, রাস্তাঘাট অত্যন্ত নোংরা এবং অস্বাস্থ্যকর। এই সমস্ত কঠোর বাস্তব পরিস্থিতির কথাই স্বামীজি চিঠিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন।
5. “নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে।” – বক্তা কে? তিনি কাকে, কেন এই কথা বলেছেন? এই উক্তির মধ্য দিয়ে বক্তার কোন্ মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে? (1+1+3=5)
উত্তর দেখো
বক্তা ও উদ্দেশ্য: উক্তিটির বক্তা হলেন স্বামী বিবেকানন্দ। তিনি তাঁর শিষ্যা মিস মার্গারেট নোবেলকে (ভগিনী নিবেদিতা) উদ্দেশ্য করে এই কথা বলেছেন।
উপদেশ দেওয়ার কারণ: ভারতে এসে কাজের ক্ষেত্রে মিস নোবেলকে অনেক প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হবে। স্বামীজির সহকর্মী মিস মুলার নিজেকে নেত্রী মনে করেন এবং অন্যের ওপর কর্তৃত্ব ফলাতে ভালোবাসেন। মিস নোবেল যদি মিস মুলারের আশ্রয়ে বা তাঁর ওপর নির্ভরশীল হয়ে কাজ শুরু করেন, তবে মিস মুলারের খবরদারির কারণে তাঁর পক্ষে স্বাধীনভাবে ভারতের নারীসমাজের কল্যাণে কাজ করা সম্ভব হবে না। তাই স্বামীজি তাঁকে কারও মুখাপেক্ষী না হয়ে সম্পূর্ণ নিজের স্বাধীন সত্তায় এবং নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে কাজ শুরু করার উপদেশ দিয়েছেন।
বক্তার মনোভাব: এই উক্তির মধ্য দিয়ে স্বামী বিবেকানন্দের তীব্র স্বাবলম্বন, আত্মমর্যাদাবোধ এবং দূরদৃষ্টির পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি বিশ্বাস করতেন যে পরাধীনতার মনোভাব বা অন্যের অধীনে থেকে কোনো মহৎ কাজ করা যায় না। তাঁর শিষ্যাও যেন কারও দয়ার পাত্রী না হয়ে স্বাধীন মানসিকতা নিয়ে মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করতে পারেন, সেই মহান গুরুর আদর্শই এখানে পরিস্ফুট হয়েছে।