নবম শ্রেণি: বাংলা, স্বপ্নপর্ণী (প্রফেসর শঙ্কুর ডাইরি) – সত্যজিৎ রায়, দীর্ঘ রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর মান 5
সহায়ক পাঠ: স্বর্ণপর্ণী
(বর্ণনামূলক প্রশ্নোত্তর – মান: 5)
নিচের প্রশ্নগুলির নির্দেশমতো বিস্তারিত উত্তর দাও:
1. ‘স্বর্ণপর্ণী’ গল্প অবলম্বনে প্রফেসর শঙ্কুর বাবা ত্রিপুরাকেশ্বর শঙ্কুর চরিত্রটি বিশ্লেষণ করো। (5)
উত্তর দেখো
ক) নিষ্ঠাবান চিকিৎসক: তিনি পেশায় কবিরাজ ছিলেন এবং প্রাচীন ভারতীয় আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের ওপর তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল। তিনি কেবল রোগ সারাতেন না, রোগের মূল কারণ অনুসন্ধানে আগ্রহী ছিলেন।
খ) মানবতাবাদ ও নিঃস্বার্থ সেবা: ত্রিপুরাকেশ্বর বাবু অর্থের বিনিময়ে চিকিৎসা করতেন না। তিনি দরিদ্র রোগীদের বিনামূল্যে ওষুধ ও পথ্য দিতেন। তাঁর কাছে মানবসেবাই ছিল পরম ধর্ম।
গ) আধ্যাত্মিক ও অনুসন্ধিৎসু মন: টিকলিবাবার মতো সাধুর কাছ থেকে স্বর্ণপর্ণী গাছের সন্ধান পেয়ে তিনি তা নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। তিনি চেয়েছিলেন এমন এক ‘স্বর্ণবটিকা’ তৈরি করতে যা মানুষের সব জরা ও ব্যাধি দূর করবে।
ঘ) শঙ্কুর অনুপ্রেরণা: শঙ্কুর বৈজ্ঞানিক চেতনার মূলে ছিলেন তাঁর বাবা। বাবার সততা, নীতিবোধ এবং পরোপকারী মানসিকতাই শঙ্কুর বিজ্ঞানী জীবনের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল।
2. স্বর্ণপর্ণী গাছটি পাওয়ার ইতিহাস এবং এর ওষধি গুণাগুণ সম্পর্কে আলোচনা করো। (5)
উত্তর দেখো
প্রাপ্তির ইতিহাস: বাবার মৃত্যুর অনেক বছর পর তাঁর ডায়েরির বর্ণনা অনুযায়ী শঙ্কু হিমাচল প্রদেশের কাসৌলি নামক পাহাড়ে অভিযানে যান। সেখানে একটি জলপ্রপাতের কাছে তিনি সেই দুর্লভ স্বর্ণপর্ণী গাছটি খুঁজে পান।
ওষধি গুণাগুণ: এই গাছের প্রধান বিশেষত্ব হলো এর শুকনো পাতা। পাতা শুকিয়ে চূর্ণ করে রস তৈরি করলে তা সর্বরোগহর মহৌষধে পরিণত হয়। এটি মানুষের স্নায়বিক ও শারীরিক শক্তি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয় এবং ‘অস্টিও-মায়োলাইটিস’-এর মতো দুরারোগ্য হাড়ের রোগ নিরাময়ে সক্ষম। শঙ্কুর বিশ্ববিখ্যাত আবিষ্কার ‘মিরাকিউরল’ বড়ির প্রধান উপাদান হলো এই স্বর্ণপর্ণী।
3. বিলেতের বিজ্ঞানী সন্ডার্সকে শঙ্কু কীভাবে রোগমুক্ত করেছিলেন? সেই ঘটনার তাৎপর্য লেখো। (5)
উত্তর দেখো
আরোগ্য দান: শঙ্কু ল্যাঙ্কাশায়ারে গিয়ে সন্ডার্সকে দেখেন এবং তাঁর ওপর নিজের তৈরি ‘মিরাকিউরল’ বড়ি প্রয়োগ করেন। মাত্র একটি বড়ি খাওয়ার চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে সন্ডার্সের যন্ত্রণার উপশম হয় এবং পচন ধরা হাড় অলৌকিকভাবে সুস্থ হয়ে ওঠে। কয়েক দিনের মধ্যেই সন্ডার্স উঠে হাঁটাচলা শুরু করেন।
তাৎপর্য: এই ঘটনাটি শঙ্কুর বিজ্ঞানী জীবনে এক টার্নিং পয়েন্ট ছিল। এর মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেন যে ভারতীয় আয়ুর্বেদ এবং আধুনিক বিজ্ঞানের সংমিশ্রণ অসাধ্য সাধন করতে পারে। সন্ডার্স সুস্থ হওয়ার পর শঙ্কুকে এক মোটা অঙ্কের চেক দিতে চাইলে শঙ্কু তা নিতে অস্বীকার করেন, যা তাঁর উচ্চ আদর্শ ও নির্লোভ মানসিকতাকে বিশ্বদরবারে উজ্জ্বল করে তোলে।
4. ‘স্বর্ণপর্ণী’ গল্পে কীভাবে বিজ্ঞান ও মানবিকতা এক হয়ে মিলেছে তা বুঝিয়ে দাও। (5)
উত্তর দেখো
প্রথমত, শঙ্কুর বাবা তাঁর আয়ুর্বেদিক জ্ঞানকে কোনোদিন ব্যবসার কাজে লাগাননি। তিনি বিশ্বাস করতেন যে আরোগ্যদান হলো ঈশ্বরের সেবা। দ্বিতীয়ত, শঙ্কু নিজে যখন সন্ডার্সকে বাঁচাতে বিলেতে যান, তখন তিনি লাভের কথা ভাবেননি। সন্ডার্সের মতো একজন প্রতিভাধর বিজ্ঞানীর জীবন রক্ষা করাকেই তিনি বড় সাফল্য বলে মনে করেছেন। সন্ডার্স চেক দিতে চাইলে শঙ্কু বলেছিলেন যে তাঁর বাবা এই ওষুধের কোনো দাম নিতে বারণ করেছেন।
গল্পের শেষে দেখা যায়, বিজ্ঞান যখন মানুষের স্বার্থপরতা ও লোভের ঊর্ধ্বে ওঠে, তখনই তার প্রকৃত মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বর্ণপর্ণীর ওষধি শক্তি এবং শঙ্কুর নিঃস্বার্থ সেবা— এই দুয়ের মিলনেই গল্পটি একটি উচ্চতর মানবিক দর্শনে পৌঁছেছে।
5. “বাবার অসমাপ্ত কাজ শেষ করলাম”— প্রফেসর শঙ্কু কোন কাজের কথা বলেছেন? তাঁর অনুভূতি বর্ণনা করো। (5)
উত্তর দেখো
অসমাপ্ত কাজ পূর্ণ করা: শঙ্কু বাবার ডায়েরি পড়ে অনুপ্রাণিত হয়ে কাসৌলি থেকে সেই বিরল গাছটি সংগ্রহ করেন। এরপর ল্যাবরেটরিতে দীর্ঘ গবেষণার পর তিনি ‘মিরাকিউরল’ বড়ি তৈরি করেন যা বাবার পরিকল্পিত ‘স্বর্ণবটিকা’র আধুনিক রূপ। সন্ডার্সকে সুস্থ করার মাধ্যমে তিনি এই ওষুধের কার্যকারিতা বিশ্বজুড়ে প্রমাণ করেন।
অনুভূতি: এই কাজ সফল করার পর শঙ্কু এক গভীর আত্মতৃপ্তি লাভ করেন। তাঁর মনে হয়েছিল, তিনি কেবল একটি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারই করেননি, বরং বাবার স্মৃতির প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। বিদেশের মাটিতে সন্ডার্সের কৃতজ্ঞতা এবং কৃতজ্ঞ স্ত্রী ডরোথির হাসি দেখে শঙ্কুর মনে হয়েছিল তাঁর জীবন ধন্য হয়েছে।