সপ্তম শ্রেণি: ইতিহাস, অধ্যায় ২: ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের কয়েকটি ধারা, সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর
অধ্যায় ২: ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের কয়েকটি ধারা
(সংক্ষিপ্ত ও বিশ্লেষণমূলক প্রশ্নোত্তর – মান: ২/৩)
✍️ ২/৩ নম্বরের গুরুত্বপূর্ণ ১৫টি প্রশ্নোত্তর:
১. ‘মাৎস্যন্যায়’ বলতে কী বোঝো?
উত্তর: ‘মাৎস্যন্যায়’ হলো প্রাচীন বাংলার এক চরম অরাজকতার অবস্থা। পুকুরের বড়ো মাছ যেমন ছোটো মাছকে গিলে খায়, তেমনি রাজা শশাঙ্কের মৃত্যুর পর (৬৩৭ খ্রিঃ) বাংলায় কোনো যোগ্য শাসক না থাকায়, শক্তিশালী ও ধনী লোকরা দুর্বলদের ওপর চরম অত্যাচার শুরু করে। প্রায় ১০০ বছর ধরে চলা এই ভয়ংকর অরাজকতা ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিকেই ঐতিহাসিকরা ‘মাৎস্যন্যায়’ বলে বর্ণনা করেছেন। অবশেষে ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে পাল বংশের রাজা গোপাল সিংহাসনে বসলে এই অরাজকতার অবসান ঘটে।
২. ত্রিশক্তি সংগ্রাম কাদের মধ্যে এবং কেন হয়েছিল?
উত্তর: অষ্টম শতকে উত্তর ভারতের প্রাণকেন্দ্র ‘কনৌজ’ দখল করার জন্য তিনটি প্রধান রাজবংশের মধ্যে যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ হয়েছিল, তাকেই ত্রিশক্তি সংগ্রাম বলা হয়।
অংশগ্রহণকারী শক্তি: এই যুদ্ধে মূলত বাংলার পাল বংশ, পশ্চিম ভারতের গুর্জর-প্রতীহার বংশ এবং দক্ষিণ ভারতের রাষ্ট্রকূট বংশ অংশ নিয়েছিল।
কারণ: হর্ষবর্ধনের পর কনৌজ হয়ে উঠেছিল উত্তর ভারতের সবচেয়ে ধনী ও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ শহর। তাই কনৌজ দখল করার অর্থ ছিল সমগ্র উত্তর ভারতে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। এই উদ্দেশ্যেই প্রায় ২০০ বছর ধরে এই তিন শক্তির মধ্যে সংগ্রাম চলেছিল।
৩. পাল বংশের প্রতিষ্ঠা কীভাবে হয়েছিল?
উত্তর: শশাঙ্কের মৃত্যুর পর বাংলায় ‘মাৎস্যন্যায়’ বা চরম অরাজকতার সৃষ্টি হয়। এই বিশৃঙ্খলা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য অষ্টম শতকের মাঝামাঝি (আনুমানিক ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে) বাংলার প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ এবং সাধারণ মানুষ একত্রিত হয়ে গোপাল নামক এক সামরিক নেতাকে তাদের রাজা হিসেবে নির্বাচিত করেন। গোপালের এই সিংহাসন আরোহণের মাধ্যমেই বাংলায় পাল বংশের প্রতিষ্ঠা হয় এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতার অবসান ঘটে।
৪. কৈবর্ত বিদ্রোহের কারণ ও ফলাফল সংক্ষেপে লেখো।
উত্তর: পাল রাজা দ্বিতীয় মহীপালের রাজত্বকালে একাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বরেন্দ্র অঞ্চলে (উত্তরবঙ্গ) কৈবর্ত বিদ্রোহ ঘটেছিল।
কারণ: কৈবর্তরা ছিল মূলত জেলে ও নৌকার মাঝি। পাল রাজাদের অতিরিক্ত করের বোঝা এবং ক্রমাগত শোষণের ফলে তারা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে।
নেতা: এই বিদ্রোহের প্রধান নেতারা ছিলেন দিব্য (বা ভীম) এবং রুদোক।
ফলাফল: বিদ্রোহীরা দ্বিতীয় মহীপালকে হত্যা করে বরেন্দ্রভূমি দখল করে নেয়। পরবর্তীকালে রামপাল অনেক কষ্টে সামন্ত রাজাদের সাহায্যে ভীমকে পরাজিত ও হত্যা করে বরেন্দ্রভূমি পুনরুদ্ধার করেন।
৫. ‘রামচরিত’ কাব্য থেকে আমরা কী জানতে পারি?
উত্তর: ‘রামচরিত’ কাব্যটি রচনা করেছিলেন পাল যুগের বিখ্যাত কবি সন্ধ্যাকর নন্দী। এটি একটি বিশেষ ধরনের কাব্য, যেখানে প্রতিটি শ্লোকের দুটি করে অর্থ আছে।
এই কাব্যের একদিকের অর্থে রামায়ণের রামচন্দ্র এবং সীতা উদ্ধারের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। আর অন্যদিকের অর্থে পাল রাজা রামপালের জীবন, তাঁর সিংহাসন লাভ এবং বরেন্দ্রভূমির কৈবর্ত বিদ্রোহ দমন করার ঐতিহাসিক কাহিনি খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এই কাব্যটি বাংলার ইতিহাসের একটি অমূল্য সম্পদ।
৬. সেন রাজাদের আদি বাসভূমি কোথায় ছিল? তাঁরা কীভাবে বাংলায় এলেন?
উত্তর: সেন রাজাদের আদি বাসভূমি ছিল দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক বা কর্ণাট অঞ্চল। তাঁরা জাতিতে ছিলেন ব্রাহ্মণ এবং পেশায় ছিলেন ক্ষত্রিয় (ব্রহ্মক্ষত্রিয়)।
পাল সম্রাটদের রাজত্বকালে কর্ণাট অঞ্চল থেকে অনেক সেনাপতি ও সৈনিক বাংলায় এসে পালদের সৈন্যবাহিনীতে চাকরি গ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে, পাল সাম্রাজ্য যখন দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন সামন্ত সেনের নেতৃত্বে এই কর্ণাট বংশীয় সেনাপতিরাই বিদ্রোহ করে বাংলায় সেন বংশের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন।
৭. বল্লাল সেনের রাজত্বকালের প্রধান কীর্তিগুলি কী কী?
উত্তর: বল্লাল সেন ছিলেন সেন বংশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক। তাঁর প্রধান কীর্তিগুলি হলো:
১. রাজ্য বিস্তার: তিনি গৌড়, রাঢ়, বরেন্দ্র এবং মিথিলা জয় করে সেন সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ঘটিয়েছিলেন।
২. সমাজ সংস্কার: তিনি হিন্দু সমাজে রক্ষণশীলতার প্রসার ঘটান এবং ‘কৌলীন্য প্রথা’ প্রবর্তন করেন বলে মনে করা হয়।
৩. সাহিত্যানুরাগ: তিনি নিজে একজন পণ্ডিত ব্যক্তি ছিলেন এবং ‘দানসাগর’ ও ‘অদ্ভুতসাগর’ নামক দুটি অমূল্য গ্রন্থ রচনা করেছিলেন।
৮. বখতিয়ার খলজি কীভাবে বাংলা (নদিয়া) জয় করেন?
উত্তর: ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে তুর্কি সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি এক অভিনব কায়দায় বাংলা আক্রমণ করেন। তিনি তাঁর মূল সেনাবাহিনী পেছনে রেখে মাত্র ১৮ জন ঘোড়সওয়ার সেনাকে সাথে নিয়ে ঘোড়া ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশে সেন রাজা লক্ষণ সেনের রাজধানী নদিয়ায় (নবদ্বীপ) প্রবেশ করেন। আকস্মিক এই আক্রমণে লক্ষণ সেন ঘাবড়ে যান এবং কোনো প্রতিরোধ না করেই নৌকাযোগে পূর্ববঙ্গে পালিয়ে যান। এভাবেই প্রায় বিনা যুদ্ধে বখতিয়ার খলজি বাংলা দখল করেন।
৯. চোল সাম্রাজ্যের উত্থানে প্রথম রাজরাজের ভূমিকা কী ছিল?
উত্তর: চোল রাজাদের মধ্যে প্রথম রাজরাজ চোল ছিলেন অত্যন্ত পরাক্রমশালী। তাঁর রাজত্বকালেই চোল সাম্রাজ্য দক্ষিণ ভারতে এক বিশাল শক্তিতে পরিণত হয়।
১. তিনি একটি শক্তিশালী নৌবাহিনী গঠন করেন।
২. তিনি কেরালা, পাণ্ড্য রাজ্য এবং সিংহলের (শ্রীলঙ্কা) একাংশ জয় করেন।
৩. তাঁর আমলে চোলদের বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটে এবং তা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। তিনি তাঞ্জোরে একটি বিখ্যাত শিব মন্দিরও নির্মাণ করেছিলেন।
১০. প্রথম রাজেন্দ্র চোল কেন ‘গঙ্গাইকোণ্ডচোল’ উপাধি নিয়েছিলেন?
উত্তর: প্রথম রাজেন্দ্র চোল ছিলেন দক্ষিণ ভারতের চোল সাম্রাজ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্রাট। তিনি তাঁর সামরিক শক্তি প্রমাণের জন্য দক্ষিণ থেকে উত্তর ভারত অভিমুখে এক বিশাল সৈন্যবাহিনী পাঠান। এই বাহিনী গাঙ্গেয় উপত্যকা বা বাংলা পর্যন্ত পৌঁছে যায় এবং বাংলার পাল রাজাদের পরাজিত করে। গঙ্গা নদী পর্যন্ত এই বিজয় অভিযান সম্পন্ন করার আনন্দে ও গৌরবে তিনি ‘গঙ্গাইকোণ্ডচোল’ (গঙ্গা বিজয়ী চোল) উপাধি গ্রহণ করেছিলেন।
১১. চোলদের স্থানীয় বা গ্রাম শাসন ব্যবস্থা কেমন ছিল?
উত্তর: চোলদের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল তাদের চমৎকার গ্রাম শাসন বা স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থা।
১. গ্রামের সাধারণ কৃষকদের নিয়ে গড়ে ওঠা পরিষদকে বলা হতো ‘উর’।
২. কয়েকটি গ্রাম নিয়ে গঠিত হতো একটি ‘নাড়ু’।
৩. উর এবং নাড়ু স্থানীয়ভাবে বিচার, খাজনা আদায়, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং মন্দির রক্ষণাবেক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো নিজেরাই পরিচালনা করত। এর ফলে সাধারণ মানুষ প্রশাসনে সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ পেত।
১২. খলিফা কে? ইসলামী জগতে তাঁর গুরুত্ব কী ছিল?
উত্তর: আরবি শব্দ ‘খলিফা’-এর অর্থ হলো প্রতিনিধি বা উত্তরাধিকারী। হজরত মহম্মদের মৃত্যুর পর ইসলামী জগতের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব যাঁদের হাতে যায়, তাঁরাই ‘খলিফা’ নামে পরিচিত হন।
গুরুত্ব: খলিফাকে সমগ্র মুসলিম জাহানের প্রধান বা ঈশ্বর প্রেরিত প্রতিনিধি বলে মান্য করা হতো। মধ্যযুগে অনেক মুসলিম শাসক সিংহাসনে বসার পর খলিফার কাছ থেকে অনুমোদন বা ‘অনুমোদনপত্র’ গ্রহণ করতেন, যাতে প্রজারা তাঁদের বৈধ শাসক হিসেবে মেনে নেয়।
১৩. শশাঙ্কের সাথে বৌদ্ধ ধর্মের সম্পর্ক কেমন ছিল বলে জানা যায়?
উত্তর: শশাঙ্ক নিজে ছিলেন শিবের উপাসক বা শৈব। বানভট্টের ‘হর্ষচরিত’ এবং চৈনিক পর্যটক হিউয়েন সাংয়ের বিবরণ অনুযায়ী, শশাঙ্ককে বৌদ্ধ বিদ্বেষী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। হিউয়েন সাং লিখেছেন যে শশাঙ্ক বহু বৌদ্ধ স্তূপ ধ্বংস করেছিলেন এবং বোধগয়ার পবিত্র বোধিবৃক্ষ কেটে দিয়েছিলেন।
তবে আধুনিক ঐতিহাসিকদের মতে, এই বিবরণ কিছুটা অতিরঞ্জিত হতে পারে। কারণ শশাঙ্কের মৃত্যুর কিছুদিন পরেও বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মের সমৃদ্ধির প্রমাণ পাওয়া গেছে।
১৪. পাল যুগের দুজন বিখ্যাত শিল্পীর নাম লেখো এবং তাঁদের অবদান কী ছিল?
উত্তর: পাল যুগে ভাস্কর্য ও চিত্রকলায় ব্যাপক উন্নতি হয়েছিল। এই যুগের দুজন সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পী ছিলেন ধীমান এবং তাঁর পুত্র বীটপাল।
অবদান: তাঁরা মূলত ব্রোঞ্জ, পাথর এবং ধাতু দিয়ে তৈরি ভাস্কর্য নির্মাণে অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন। পাল আমলের অসাধারণ সুন্দর দেবদেবীর মূর্তি ও বৌদ্ধ ভাস্কর্যগুলি প্রধানত তাঁদেরই সৃষ্টি বলে মনে করা হয়। তাঁরা পাল শিল্পরীতিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন।
১৫. বিক্রমশীল মহাবিহার কে, কেন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন?
উত্তর: পাল বংশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্রাট ধর্মপাল বিক্রমশীল মহাবিহার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
কারণ: ধর্মপাল নিজে ছিলেন একজন পরম বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। বৌদ্ধ ধর্ম, দর্শন এবং শিক্ষার প্রসারের জন্যই তিনি অষ্টম শতকের শেষদিকে মগধের (বর্তমান বিহার) উত্তরভাগে গঙ্গা নদীর তীরে এই সুবিশাল মহাবিহার বা বিশ্ববিদ্যালয়টি স্থাপন করেন। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি এটিও সেযুগে শিক্ষার এক প্রধান প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠেছিল।