মকটেস্ট বেছে নাও

অফলাইন মকটেস্ট

খুব শীঘ্রই আপলোড হবে!

সপ্তম শ্রেণি: ইতিহাস, অধ্যায় ২: ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের কয়েকটি ধারা, দীর্ঘ রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর

অধ্যায় ২: ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের কয়েকটি ধারা
(দীর্ঘ উত্তরধর্মী বা রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর – মান: ৫)

📝 ৫ নম্বরের গুরুত্বপূর্ণ ৬টি প্রশ্নোত্তর:

১. রাজা শশাঙ্কের শাসনকাল ও তাঁর কৃতিত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করো।

উত্তর: সপ্তম শতকে বাংলার প্রথম স্বাধীন ও সার্বভৌম রাজা ছিলেন শশাঙ্ক। তিনি গৌড় রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং তাঁর রাজধানী ছিল কর্ণসুবর্ণ। তাঁর কৃতিত্বগুলি নিচে আলোচনা করা হলো:

  • সাম্রাজ্য বিস্তার: শশাঙ্ক কেবল গৌড়েই আবদ্ধ ছিলেন না। তিনি দণ্ডভুক্তি (মেদিনীপুর), উৎকল (ওড়িশা) এবং কোঙ্গোদ জয় করেন। এছাড়া পশ্চিমে মগধ (বিহার) পর্যন্ত তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল।
  • শত্রুদের মোকাবিলা: শশাঙ্কের প্রধান শত্রু ছিলেন কনৌজের রাজা হর্ষবর্ধন এবং কামরূপের (আসাম) রাজা ভাস্করবর্মন। এই দুই শক্তিশালী রাজা গৌড় আক্রমণ করলেও শশাঙ্ক অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে তাঁর স্বাধীনতা বজায় রেখেছিলেন।
  • ধর্মীয় নীতি: শশাঙ্ক নিজে ছিলেন শিবের উপাসক (শৈব)। হিউয়েন সাং এবং বাণভট্টের বিবরণীতে তাঁকে ‘বৌদ্ধ-বিদ্বেষী’ বলা হয়েছে। বলা হয়, তিনি বোধগয়ার বোধিবৃক্ষ কেটে দিয়েছিলেন। তবে আধুনিক ঐতিহাসিকরা মনে করেন, এটি তাঁর শত্রুদের অতিরঞ্জিত প্রচার হতে পারে।
  • অর্থনৈতিক ব্যবস্থা: তাঁর আমলে কর্ণসুবর্ণ একটি অন্যতম প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। সেসময় সোনার মুদ্রার প্রচলন ছিল, যা তাঁর রাজ্যের আর্থিক সমৃদ্ধির প্রমাণ দেয়।

উপসংহার: মাত্র কয়েক দশকের শাসনে শশাঙ্ক খণ্ডিত বাংলাকে একত্রিত করে একটি শক্তিশালী গৌড় সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন, যা বাংলার ইতিহাসে এক অনন্য কীর্তি।

২. ত্রিশক্তি সংগ্রাম কী? এর কারণ ও ফলাফল আলোচনা করো।

উত্তর: অষ্টম শতক থেকে উত্তর ভারতের প্রাণকেন্দ্র ‘কনৌজ’ দখল করার জন্য ভারতের তিনটি শক্তিশালী রাজবংশের মধ্যে যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ শুরু হয়, ইতিহাসে তা ‘ত্রিশক্তি সংগ্রাম’ নামে পরিচিত। এই তিনটি শক্তি হলো—বাংলার পাল বংশ, পশ্চিম ও মধ্য ভারতের গুর্জর-প্রতীহার বংশ এবং দক্ষিণ ভারতের রাষ্ট্রকূট বংশ।

ত্রিশক্তি সংগ্রামের কারণ:

  • কনৌজের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব: কনৌজ গঙ্গা-যমুনা দোয়াব অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় এখানকার জমি ছিল অত্যন্ত উর্বর। এছাড়া, এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথের সংযোগস্থল।
  • সাম্রাজ্যিক মর্যাদা: আগে পাটলিপুত্র যেমন সমগ্র ভারতের ক্ষমতার কেন্দ্র ছিল, হর্ষবর্ধনের পর কনৌজ সেই মর্যাদা লাভ করে। কনৌজ দখল করার অর্থ ছিল সমগ্র উত্তর ভারতে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করা।

ফলাফল:

  • এই সংগ্রাম প্রায় ২০০ বছর ধরে চলেছিল।
  • পাল সম্রাট ধর্মপাল কিছুদিনের জন্য কনৌজ দখল করলেও, শেষপর্যন্ত কোনো শক্তিই পাকাপাকিভাবে কনৌজ নিজেদের দখলে রাখতে পারেনি।
  • দীর্ঘ যুদ্ধের ফলে তিনটি রাজবংশই আর্থিকভাবে এবং সামরিক দিক থেকে অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে, যার সুযোগ নিয়ে পরে তুর্কিরা ভারত আক্রমণ করতে সক্ষম হয়।

৩. পাল সাম্রাজ্যের বিস্তারে রাজা ধর্মপাল ও দেবপালের কৃতিত্ব আলোচনা করো।

উত্তর: গোপালের পর তাঁর পুত্র ধর্মপাল এবং পৌত্র দেবপালের রাজত্বকাল ছিল পাল সাম্রাজ্যের তথা সমগ্র বাংলার ইতিহাসের এক সুবর্ণ যুগ।

ধর্মপালের কৃতিত্ব (৭৭০-৮১০ খ্রিঃ):

  • ত্রিশক্তি সংগ্রামে অংশগ্রহণ: ধর্মপাল উত্তর ভারতের আধিপত্য বিস্তারের জন্য কনৌজ দখলের যুদ্ধে অবতীর্ণ হন এবং কিছু সময়ের জন্য কনৌজ জয় করে সেখানে নিজের অনুগত শাসক বসাতে সক্ষম হন।
  • উপাধি ধারণ: তাঁর বিশাল শক্তির পরিচায়ক হিসেবে তিনি ‘পরমেশ্বর’, ‘পরমভট্টারক’ ও ‘মহারাজাধিরাজ’ উপাধি গ্রহণ করেন।
  • সাংস্কৃতিক অবদান: একজন পরম বৌদ্ধ হিসেবে তিনি শিক্ষার প্রসারে বিহারের ভাগলপুরের কাছে বিখ্যাত ‘বিক্রমশীল মহাবিহার’ প্রতিষ্ঠা করেন।

দেবপালের কৃতিত্ব (৮১০-৮৫০ খ্রিঃ):

  • সাম্রাজ্য বিস্তার: দেবপাল ছিলেন পাল বংশের শ্রেষ্ঠ সম্রাট। তিনি আসাম (প্রাগজ্যোতিষপুর) এবং ওড়িশা (উৎকল) জয় করে পাল সাম্রাজ্যের সীমানা বহুদূর বিস্তৃত করেন।
  • বৈদেশিক সম্পর্ক: তাঁর সময় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সুমাত্রা, জাভা অঞ্চলের শৈলেন্দ্র বংশীয় রাজা বালপুত্রদেবের সঙ্গে পাল সাম্রাজ্যের সুসম্পর্ক তৈরি হয়। বালপুত্রদেবের অনুরোধে দেবপাল নালন্দায় একটি বৌদ্ধ মঠ নির্মাণের জন্য পাঁচটি গ্রাম দান করেছিলেন।

৪. দক্ষিণ ভারতে চোল সাম্রাজ্যের উত্থান এবং তাদের গ্রাম শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে লেখো।

উত্তর: দক্ষিণ ভারতের কাবেরী বদ্বীপ অঞ্চলে মুত্তারাইয়ার নামক এক সামন্ত রাজাকে হারিয়ে বিজয়ালয় নবম শতকে চোল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। তবে চোলদের শ্রেষ্ঠত্ব আসে প্রথম রাজরাজ এবং প্রথম রাজেন্দ্র চোলের সময়।

চোলদের উত্থান ও বিস্তার:

  • প্রথম রাজরাজ: তিনি এক বিশাল নৌবাহিনী তৈরি করেন এবং পাণ্ড্য রাজ্য, কেরালা ও শ্রীলঙ্কার কিছু অংশ জয় করেন।
  • প্রথম রাজেন্দ্র চোল: তিনি সমগ্র শ্রীলঙ্কা জয় করেন। তাঁর বাহিনী বাংলার পাল রাজাদের পরাজিত করে। এই বিজয়ের স্মারক হিসেবে তিনি ‘গঙ্গাইকোণ্ডচোল’ উপাধি নেন এবং ‘গঙ্গাইকোণ্ডচোলপুরম’ নামে এক নতুন রাজধানী স্থাপন করেন।

চোলদের গ্রাম শাসন ব্যবস্থা (স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন):

  • উর ও নাড়ু: চোলদের সবচেয়ে বড়ো কৃতিত্ব ছিল তাদের গণতান্ত্রিক গ্রাম শাসন ব্যবস্থা। গ্রামের কৃষকদের নিয়ে তৈরি পরিষদকে বলা হতো ‘উর’। কয়েকটি গ্রাম নিয়ে গঠিত হতো ‘নাড়ু’
  • কাজকর্ম: উর এবং নাড়ু মিলে স্থানীয় বিচার ব্যবস্থা, খাজনা আদায়, সেচ খালের রক্ষণাবেক্ষণ এবং মন্দিরের দেখভালের দায়িত্ব সামলাত।
  • নগর ও সভা: ব্যবসায়ীদের সংগঠনকে বলা হতো ‘নগরম’। এছাড়া ব্রাহ্মণদের গ্রামগুলি পরিচালনার জন্য ‘মহাসভা’ বা ‘সভা’ নামক সমিতি ছিল, যার সদস্যরা লটারি বা নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হতেন।

৫. বাংলায় সেন বংশের শাসনকাল, বিশেষত বল্লাল সেন ও লক্ষণ সেনের কৃতিত্ব আলোচনা করো।

উত্তর: একাদশ শতকে পাল সাম্রাজ্যের পতনের সুযোগ নিয়ে সামন্ত সেনের হাত ধরে বাংলায় সেন বংশের উত্থান ঘটে। সেনরা মূলত দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক অঞ্চল থেকে এসেছিলেন।

বল্লাল সেনের কৃতিত্ব:

  • রাজ্য বিস্তার: তিনি পালদের পুরোপুরি পরাজিত করে গৌড়, রাঢ়, বরেন্দ্রভূমি এবং মিথিলা জয় করে সেন সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটান।
  • সমাজ সংস্কার: তিনি হিন্দু সমাজে বর্ণভেদ প্রথা কঠোর করেন এবং ‘কৌলীন্য প্রথা’ প্রবর্তন করেন বলে জানা যায়।
  • সাহিত্যানুরাগ: বল্লাল সেন ছিলেন একাধারে যোদ্ধা ও পণ্ডিত। তিনি ‘দানসাগর’‘অদ্ভুতসাগর’ নামে দুটি বিখ্যাত গ্রন্থ রচনা করেন।

লক্ষণ সেনের কৃতিত্ব:

  • রাজধানী ও শাসন: তাঁর রাজধানী ছিল গৌড় এবং দ্বিতীয় রাজধানী ছিল নদিয়া (নবদ্বীপ)। তিনি প্রয়াগ, বারাণসী ও পুরীতে বিজয়স্তম্ভ স্থাপন করেছিলেন।
  • শিল্প ও সাহিত্য: তাঁর রাজসভা অনেক পণ্ডিত ও কবিদের দ্বারা অলংকৃত ছিল। তাঁর সভার শ্রেষ্ঠ কবি ছিলেন জয়দেব (যিনি ‘গীতগোবিন্দম’ রচনা করেন)। এছাড়া ধোয়ী, গোবর্ধন, উমাপতিধর এবং শরণ—এই পাঁচজন কবিকে একত্রে ‘পঞ্চরত্ন’ বলা হতো।

৬. তুর্কি সেনাপতি বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয়ের বিবরণ দাও এবং এর ফলাফল কী হয়েছিল?

উত্তর: ত্রয়োদশ শতকের শুরুতে (১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে) তুর্কি সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি বাংলা আক্রমণ করেন। এই আক্রমণের ফলেই বাংলায় সেন শাসনের অবসান এবং মুসলিম শাসনের সূচনা হয়।

আক্রমণের বিবরণ:

  • অতর্কিত হানা: সেন রাজা লক্ষণ সেন তখন বয়সে বৃদ্ধ এবং নদিয়া (নবদ্বীপ) ছিল তাঁর রাজধানী। বখতিয়ার খলজি প্রচলিত পথ এড়িয়ে ঝাড়খণ্ডের গভীর জঙ্গল ভেদ করে সোজা নদিয়ার দিকে অগ্রসর হন।
  • ছদ্মবেশ: বখতিয়ার তাঁর বিশাল বাহিনী পেছনে রেখে, মাত্র ১৮ জন তুর্কি ঘোড়সওয়ারকে সাথে নিয়ে ঘোড়া ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশে রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করেন।
  • লক্ষণ সেনের পলায়ন: দুপুরের খাওয়ার সময় এই অতর্কিত আক্রমণে প্রহরীরা বাধা দেওয়ার সুযোগ পায়নি। প্রাসাদে তুমুল হইচই শুনে এবং তুর্কিদের অতর্কিত আক্রমণে ঘাবড়ে গিয়ে রাজা লক্ষণ সেন পেছনের দরজা দিয়ে নৌকায় চড়ে পূর্ববঙ্গের বিক্রমপুরে পালিয়ে যান।

ফলাফল:

  • এই আক্রমণের ফলে নদিয়া বখতিয়ার খলজির দখলে চলে আসে এবং বাংলায় সেন বংশের শাসনের পতন ঘটে।
  • বখতিয়ার খলজি গৌড় বা লখনৌতিকে তাঁর রাজধানী করেন এবং বাংলায় তুর্কি তথা মুসলিম শাসনের ভিত্তি স্থাপন করেন। তিনি বহু মসজিদ, মাদ্রাসা এবং সুফি সাধকদের জন্য আস্তানা তৈরি করেছিলেন।

Leave A Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শেয়ার