সপ্তম শ্রেণি: বাংলা, নানান দেশে নানান ভাষা – রামনিধি গুপ্ত, রচনাধর্মী প্রশ্ন উত্তর
নানান দেশে নানান ভাষা: বিস্তারিত বড় প্রশ্নোত্তর (মান: 5)
1. “নানান দেশে নানান ভাষা / বিনে স্বদেশীয় ভাষা পুরে কি আশা”—পঙ্ক্তি দুটির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।
উত্তর দেখো
কিন্তু এর পরের চরণে কবি এক গভীর সত্যের উন্মোচন করেছেন। তিনি বলেছেন যে, পৃথিবীতে যতই ভাষা থাকুক না কেন, একজন মানুষের মনের গভীর তৃষ্ণা, আবেগ, আনন্দ, দুঃখ এবং স্বপ্ন একমাত্র তার নিজের জন্মভূমির ভাষা বা মাতৃভাষার মাধ্যমেই সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করা সম্ভব। বিদেশি ভাষায় মানুষ যতই পাণ্ডিত্য অর্জন করুক না কেন, তা কেবল মস্তিষ্কের খোরাক জোগাতে পারে, কিন্তু হৃদয়ের তৃপ্তি দিতে পারে না। মায়ের মুখের ভাষায় কথা বলার মধ্যে যে স্বতঃস্ফূর্ততা এবং প্রাণের আরাম আছে, তা অন্য কোনো ভাষায় পাওয়া অসম্ভব। নিজের ভাষা ছাড়া মানুষের মনের এই গভীর ‘আশা’ বা আকাঙ্ক্ষা কখনোই পূরণ হয় না।
2. ‘নানান দেশে নানান ভাষা’ কবিতা অবলম্বনে মাতৃভাষার প্রতি কবি রামনিধি গুপ্তের যে গভীর অনুরাগের প্রকাশ ঘটেছে, তা নিজের ভাষায় লেখো।
উত্তর দেখো
তাঁর এই অনুরাগের মূলে রয়েছে মাতৃভাষার শ্রেষ্ঠত্ব এবং অপরিহার্যতার স্বীকৃতি। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, মাতৃভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি মানুষের অন্তরের ভাষা। কবি তাঁর এই ক্ষুদ্র রচনার মধ্য দিয়ে অত্যন্ত সহজ ও সাবলীলভাবে দেশবাসীকে এই বার্তা দিয়েছেন যে, নিজের ভাষাকে অবজ্ঞা করে পরকীয় ভাষার আরাধনা করলে কখনোই আত্মতৃপ্তি লাভ করা যায় না। মাতৃভাষার প্রতি তাঁর এই ঐকান্তিক ভক্তি প্রমাণ করে যে তিনি নিজের দেশ ও দেশের ভাষাকে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন এবং অন্য ভাষার আগ্রাসন থেকে তাকে সযত্নে রক্ষা করতে চেয়েছিলেন।
3. বিদেশি ভাষা শেখার প্রয়োজনীয়তা থাকলেও মাতৃভাষার গুরুত্ব কেন সবচেয়ে বেশি? কবিতার মূল ভাবের আলোকে বুঝিয়ে দাও।
উত্তর দেখো
মাতৃভাষার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি হওয়ার কারণ হলো আবেগের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ। বিদেশি ভাষা আমাদের তথ্য ও জ্ঞান দিতে পারে, কিন্তু মাতৃভাষা আমাদের মানসিক শান্তি ও প্রাণের আরাম দেয়। মানুষ যখন গভীর শোকে কাঁদে, প্রবল আনন্দে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে কিংবা নিজের মনে স্বপ্ন বুনে, তখন অবচেতনভাবেই সে তার মাতৃভাষাকেই ব্যবহার করে। মাতৃভাষা মানুষের শেকড়ের মতো, যা তাকে তার মাটি ও সংস্কৃতির সাথে যুক্ত রাখে। শিকড় ছাড়া যেমন গাছ বাঁচতে পারে না, তেমনি মাতৃভাষার চর্চা ছাড়া কোনো মানুষেরই মানসিক ও আত্মিক বিকাশ সম্পূর্ণ হতে পারে না।
4. ‘নানান দেশে নানান ভাষা’ কবিতাটির নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।
উত্তর দেখো
কবিতার শুরুতেই বলা হয়েছে, “নানান দেশে নানান ভাষা”। এই বৈচিত্র্যের প্রেক্ষাপট তৈরি করেই কবি মাতৃভাষার অনন্যতার কথা বলেছেন। পৃথিবীতে অনেক ভাষা থাকলেও একজন মানুষের কাছে তার স্বদেশি ভাষাই হলো শ্রেষ্ঠ সম্পদ। শিরোনামটি আমাদের মনে প্রথমেই বিশ্বের বিশালত্বের ধারণা তৈরি করে এবং পরমুহূর্তেই সেই বিশালতার মাঝে নিজের মাতৃভাষার প্রতি আমাদের মনোযোগকে কেন্দ্রীভূত করে। সমগ্র কবিতাটি যেহেতু এই ভাষাগত বৈচিত্র্য ও মাতৃভাষার শ্রেষ্ঠত্বকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে, তাই ‘নানান দেশে নানান ভাষা’ নামকরণটি অত্যন্ত ভাবগম্ভীর, প্রাসঙ্গিক এবং সম্পূর্ণ সার্থক হয়েছে।
5. রামনিধি গুপ্তের এই ক্ষুদ্র কবিতাটি কীভাবে যুগ যুগ ধরে বাঙালির স্বজাত্যবোধ ও ভাষাপ্রেমের অন্যতম প্রেরণা হয়ে উঠেছে তা আলোচনা করো।
উত্তর দেখো
ব্রিটিশ আমলে যখন শিক্ষিত বাঙালি সমাজ ইংরেজি ভাষার মোহে পড়ে নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে ভুলতে বসেছিল, তখন এই গানটি তাদের শেকড়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। পরবর্তীকালে, 1952 সালের মহান ভাষা আন্দোলনের সময় যখন মাতৃভাষার অধিকার বিপন্ন হয়েছিল, তখনও নিধুবাবুর এই গানটি মাতৃভাষাপ্রেমীদের মনে অফুরন্ত সাহস ও প্রেরণা জুগিয়েছে। “বিনে স্বদেশীয় ভাষা পুরে কি আশা”—এই একটিমাত্র চরণের মধ্যে যে অমোঘ সত্য লুকিয়ে আছে, তা যুগে যুগে বাঙালির মন থেকে পরাধীনতার হীনম্মন্যতা দূর করে তাদের স্বজাত্যবোধ ও ভাষাপ্রেমের মন্ত্রে দীক্ষিত করেছে।