সপ্তম শ্রেণি : বাংলা, ভারত তীর্থ – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর
অধ্যায়: ভারত তীর্থ
(দীর্ঘ / রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর – মান: 5)
নিচের প্রশ্নগুলির প্রাসঙ্গিক ও বিস্তারিত উত্তর দাও:
1. ‘ভারত তীর্থ’ কবিতায় ভারতবর্ষকে ‘মহামানবের সাগরতীর’ বলা হয়েছে কেন? এর সার্থকতা বিচার করো।
উত্তর দেখো
উত্তর: বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘ভারত তীর্থ’ কবিতায় ভারতবর্ষকে ‘মহামানবের সাগরতীর’ বলে উল্লেখ করেছেন, কারণ এই দেশ যুগে যুগে নানা জাতি, ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষের এক বিশাল মিলনক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
সাগর যেমন দূরদূরান্ত থেকে বয়ে আসা অসংখ্য নদনদীকে নিজের বুকে স্থান দেয় এবং নদীর নিজস্ব পরিচয় মুছে গিয়ে সবাই সাগরের জলে একাকার হয়ে যায়, ভারতবর্ষের ইতিহাসও ঠিক তেমনই। অতি প্রাচীনকাল থেকে আর্য, অনার্য, দ্রাবিড়, চীন, শক, হুন, পাঠান, মোগল—প্রভৃতি অসংখ্য বিদেশি জাতি বিভিন্ন সময়ে ভারতে এসেছে। কেউ এসেছে আগ্রাসনের উদ্দেশ্যে, কেউবা এসেছে আশ্রয়ের খোঁজে। কিন্তু দীর্ঘ সময়ের পরিক্রমায় তারা কেউ আর ফিরে যায়নি। ভারতের মহামিলনের পুণ্য স্রোতে তারা নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় ভুলে ভারতের মূল স্রোতে এক দেহে লীন হয়ে গেছে। অসংখ্য ভিন্ন ভিন্ন জাতির এই অভূতপূর্ব সংমিশ্রণ ও একাত্মবোধের কারণেই ভারতবর্ষকে মহামানবের সাগরতীর বলাটি সর্বৈব সার্থক ও যুক্তিযুক্ত হয়েছে।
2. “এসো হে আর্য, এসো অনার্য…” – এই আহ্বানের মধ্য দিয়ে কবির কোন্ মানসিকতার প্রকাশ ঘটেছে তা আলোচনা করো।
উত্তর দেখো
উত্তর: উদ্ধৃত পংক্তিটির মধ্য দিয়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চরম উদারতা, বিশ্বপ্রেম, সর্বজনীন মহামিলনের আকাঙ্ক্ষা এবং অসাম্প্রদায়িক মানসিকতার এক অপূর্ব প্রকাশ ঘটেছে।
ভারতবর্ষ কোনো একটি নির্দিষ্ট ধর্ম বা জাতির দেশ নয়; এটি বৈচিত্র্যের দেশ। তাই ভারতমাতার অভিষেকের এই পবিত্র উৎসবে কবি কেবল কোনো একটি বিশেষ সম্প্রদায়কে ডাকেননি। তিনি হিন্দু, মুসলমান, খ্রিষ্টান, ইংরাজ—সকলকেই আহ্বান করেছেন। এমনকি সমাজে যারা যুগ যুগ ধরে অবহেলিত ও অস্পৃশ্য, সেই তথাকথিত নিচু জাত বা ‘পতিত’ এবং অহংকারী ব্রাহ্মণ—উভয়কেই তিনি কাঁধে কাঁধ মেলাতে বলেছেন। কবির মতে, ভারত হলো সকলের মিলনতীর্থ, এখানে কেউ বহিরাগত বা পর নয়। জাতি, ধর্ম বা বর্ণের সমস্ত ভেদাভেদ ও ছুঁতমার্গ ভুলে সকলে যখন এক হয়ে একে অপরের হাত ধরবে, তখনই ভারতের প্রকৃত রূপটি ফুটে উঠবে। এই মহান মিলনের সাধনাই কবির প্রধান লক্ষ্য।
3. ‘ভারত তীর্থ’ কবিতায় ‘মার অভিষেক’ বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন? কীভাবে এই অভিষেক সম্পন্ন হবে বলে তিনি মনে করেন?
উত্তর দেখো
উত্তর: ‘ভারত তীর্থ’ কবিতায় ‘মার অভিষেক’ বলতে কবি আমাদের পরম পূজনীয় মাতৃভূমি অর্থাৎ ভারতমাতার পূজার্চনা, বন্দনা বা তাঁর প্রকৃত গৌরব প্রতিষ্ঠার কথা বুঝিয়েছেন।
কবির মতে, এই পবিত্র অভিষেক কোনো সাধারণ তীর্থের জল বা নিছক মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে সম্পন্ন হতে পারে না। এই অভিষেক সম্পন্ন করতে হলে ভারতের সমস্ত মানুষকে—সে আর্য হোক বা অনার্য, হিন্দু হোক বা মুসলমান, ব্রাহ্মণ হোক বা পতিত—সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সমাজে চলে আসা সমস্ত ছুঁতমার্গ, জাতপাতের অহংকার এবং ভেদাভেদ ভুলে সকলকে একে অপরের হাত ধরতে হবে। এইভাবে সকলের পবিত্র ও সমবেত স্পর্শে যে তীর্থজল পবিত্র হবে, সেই জল দিয়ে মঙ্গলঘট পূর্ণ করলেই তবেই ভারতমাতার প্রকৃত অভিষেক বা মহামিলনের উৎসব সম্পূর্ণ হবে।
4. “এসো হে পতিত, করো অপনীত সব অপমানভার” – কাদের ‘পতিত’ বলা হয়েছে? তাদের কীভাবে অপমানভার দূর করতে বলা হয়েছে?
উত্তর দেখো
উত্তর: হিন্দু সমাজের দীর্ঘদিনের কুপ্রথা ও জাতিভেদের কারণে যেসব মানুষকে যুগ যুগ ধরে নিপীড়িত, বঞ্চিত এবং তথাকথিত ‘অস্পৃশ্য’ বা নিচু জাত বলে সমাজ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে, কবি এখানে তাদেরই ‘পতিত’ বলে উল্লেখ করেছেন।
উঁচু জাতের মানুষের অহংকার ও অস্পৃশ্যতার কারণে এই পতিত মানুষেরা সারাজীবন যে লাঞ্ছনা ও অপমানের বোঝা বয়ে বেড়িয়েছে, কবি তাদের সেই অপমানের ভার দূর করতে বলেছেন। মহামিলনের পুণ্য তীর্থ ভারতবর্ষে কেউ ছোটো বা কেউ বড়ো নয়। তাই কবি এই পতিত মানুষদের আহ্বান করে বলেছেন, তারা যেন নিজেদের হীনম্মন্যতা ও সমাজের দেওয়া গ্লানি মন থেকে মুছে ফেলে। বুক চিতিয়ে, মাথা উঁচু করে সকলের সাথে এক সারিতে দাঁড়িয়ে ভারতমাতার অভিষেকের পবিত্র মঙ্গলঘট স্পর্শ করার মাধ্যমেই তাদের এই দীর্ঘদিনের অপমানভার দূর হবে এবং তারা সমাজে সমমর্যাদা লাভ করবে।
5. ‘ভারত তীর্থ’ কবিতার মূল সুর বা অন্তর্নিহিত বার্তাটি নিজের ভাষায় বিশদে লেখো।
উত্তর দেখো
উত্তর: ‘ভারত তীর্থ’ কবিতার মূল সুর হলো ‘বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য’ এবং ‘সর্বজনীন মহামিলন’।
ভারতবর্ষ কেবল একটি ভৌগোলিক ভূখণ্ড নয়, এটি একটি পবিত্র মহামিলনের তীর্থক্ষেত্র। অতি প্রাচীনকাল থেকে নানা দেশের, নানা বর্ণের মানুষ এই দেশে এসেছে এবং ভারতের বিশাল জনসমুদ্রে মিশে একাকার হয়ে গেছে। কিন্তু বর্তমান সমাজে জাতিভেদ, ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং অস্পৃশ্যতার মতো ব্যাধি সেই মিলনকে বাধাগ্রস্ত করছে। কবির সুস্পষ্ট বার্তা হলো, যতদিন না আমরা মনের সমস্ত অহংকার, বিভেদ এবং ছুঁতমার্গ দূর করতে পারব, ততদিন ভারতের প্রকৃত কল্যাণ সম্ভব নয়। ব্রাহ্মণ থেকে শুরু করে সমাজের নিম্নস্তরের মানুষ—সকলকে যখন আমরা সমান মর্যাদায় বুকে টেনে নিতে পারব, সকলের হাতের স্পর্শে যখন মহামিলনের মঙ্গলঘট পূর্ণ হবে, তখনই ভারতবর্ষ তার আসল গৌরব ফিরে পাবে। ভেদাভেদহীন, অসাম্প্রদায়িক ও ঐক্যবদ্ধ মানবসমাজ গড়াই হলো এই কবিতার চূড়ান্ত লক্ষ্য।