সপ্তম শ্রেণি: ইতিহাস, অধ্যায় ৪: দিল্লির সুলতানি (তুর্কি-আফগান শাসন) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর
অধ্যায় ৪: দিল্লির সুলতানি
(সংক্ষিপ্ত ও বিশ্লেষণমূলক প্রশ্নোত্তর – মান: ২/৩)
✍️ ২/৩ নম্বরের গুরুত্বপূর্ণ ১৫টি প্রশ্নোত্তর:
১. সুলতান ইলতুৎমিসকে কেন দিল্লি সুলতানির ‘প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা’ বলা হয়?
উত্তর: কুতুবুদ্দিন আইবক দিল্লি সুলতানির প্রতিষ্ঠা করলেও, ইলতুৎমিসকেই এর প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। কারণ, তাঁর রাজত্বকালেই সুলতানি সাম্রাজ্য একটি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়ায়। তিনি বিদ্রোহী তুর্কি আমিরদের দমন করেন, মোঙ্গল বীর চেঙ্গিজ খানের আক্রমণের হাত থেকে ভারতকে রক্ষা করেন এবং খলিফার কাছ থেকে অনুমোদন লাভ করে দিল্লি সুলতানিকে একটি স্বাধীন ও বৈধ রাষ্ট্রের স্বীকৃতি এনে দেন।
২. ‘খুতবা’ পাঠ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: ‘খুতবা’ একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ হলো ভাষণ। সুলতানি যুগে শুক্রবার জুম্মার নামাজের সময় মসজিদে ইমাম বা ধর্মীয় নেতা শাসক বা সুলতানের নামে যে প্রশংসাসূচক ধর্মীয় ভাষণ পাঠ করতেন, তাকেই খুতবা বলা হতো। খুতবায় সুলতানের নাম থাকা মানে তিনি যে ওই রাজ্যের বৈধ শাসক, তা ঈশ্বর ও জনগণের কাছে স্বীকৃত হওয়া।
৩. সুলতানা রাজিয়ার শাসনে প্রধান সমস্যা বা বাধাগুলি কী কী ছিল?
উত্তর: ইলতুৎমিসের কন্যা সুলতানা রাজিয়ার প্রধান বাধা ছিল সেযুগের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ।
১. তুর্কি অভিজাত বা আমিররা একজন নারীর অধীনে কাজ করাকে অপমানজনক বলে মনে করত।
২. রাজিয়া নারীসুলভ পোশাক ছেড়ে পুরুষের মতো পোশাক ও তলোয়ার নিয়ে দরবারে বসতেন, যা গোঁড়া উলেমাদের ক্ষুব্ধ করেছিল।
৩. তিনি অ-তুর্কিদের (যেমন- আবিসিনীয় দাস ইয়াকুত) উচ্চপদে নিয়োগ করায় তুর্কি আমিররা তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে।
৪. ‘তুর্কান-ই-চিহলগানী’ বা ‘চল্লিশ চক্র’ কী?
উত্তর: সুলতান ইলতুৎমিস তাঁর শাসনকাজ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার জন্য এবং বিশ্বস্ত অনুচর তৈরি করার লক্ষ্যে নিজের কেনা চল্লিশজন অত্যন্ত দক্ষ ও অনুগত তুর্কি দাসদের নিয়ে একটি দল গঠন করেন। এই অভিজাত দাসদের দলকেই ইতিহাসে ‘তুর্কান-ই-চিহলগানী’, ‘বন্দেগান-ই-চিহলগান’ বা ‘চল্লিশ চক্র’ বলা হয়।
৫. ‘সিজদা’ ও ‘পাইবস’ কী? কে এবং কেন এটি চালু করেন?
উত্তর: সিজদা: সুলতানের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে মাথা নত করে প্রণাম করা।
পাইবস: সুলতানের পদযুগল বা পা চুম্বন করা।
সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবন এই প্রথা দুটি চালু করেছিলেন। রাজদরবারে সুলতানের সর্বোচ্চ ক্ষমতা, সম্মান এবং ঈশ্বরপ্রদত্ত ঐশ্বরিক অধিকার বোঝানোর জন্যই তিনি এই কঠোর প্রথাগুলির প্রবর্তন করেন।
৬. সেনাবাহিনীতে ‘দাগ’ ও ‘হুলিয়া’ প্রথা কী?
উত্তর: সুলতান আলাউদ্দিন খলজি সেনাবাহিনীতে দুর্নীতি বন্ধ করার জন্য এই দুটি প্রথা চালু করেন।
দাগ: সেনাবাহিনীর ঘোড়াগুলিকে চিহ্নিত করার জন্য তাদের গায়ে গরম লোহার ছ্যাঁকা দিয়ে দাগ দেওয়া হতো, যাতে কেউ ভালো ঘোড়া চুরি করে খারাপ ঘোড়া বদলে রাখতে না পারে।
হুলিয়া: সেনাবাহিনীর প্রতিটি সৈন্যের শারীরিক বর্ণনার একটি সচিত্র রেকর্ড বা তালিকা খাতায় লিখে রাখা হতো, একেই হুলিয়া বলা হতো।
৭. আলাউদ্দিন খলজি কেন বাজারদর নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন?
উত্তর: আলাউদ্দিন খলজি তাঁর বিশাল সাম্রাজ্য রক্ষা এবং মোঙ্গলদের আক্রমণ ঠেকানোর জন্য একটি বিশাল স্থায়ী সেনাবাহিনী গঠন করেছিলেন। এত বড়ো সেনাদলকে বেশি বেতন দেওয়া রাজকোষের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই কম বেতনেও যাতে সৈন্যরা তাদের দৈনন্দিন জীবনের সব প্রয়োজন মেটাতে পারে, সেই উদ্দেশ্যে তিনি নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রতিটি জিনিসের (চাল, ডাল থেকে শুরু করে ঘোড়া, দাস-দাসী পর্যন্ত) দাম নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন।
৮. মুহম্মদ বিন তুঘলক কেন রাজধানী দেবগিরিতে (দৌলতাবাদ) স্থানান্তরিত করেছিলেন?
উত্তর: মুহম্মদ বিন তুঘলকের রাজধানী স্থানান্তরের প্রধান দুটি কারণ ছিল:
১. কেন্দ্রীয় অবস্থান: দেবগিরি ছিল তাঁর বিশাল সাম্রাজ্যের প্রায় কেন্দ্রস্থলে। তিনি মনে করেছিলেন, দেবগিরি থেকে উত্তর ও দক্ষিণ—দুই ভারতেই সমানভাবে শাসন চালানো সহজ হবে।
২. মোঙ্গল আক্রমণ থেকে রক্ষা: দিল্লি উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত হওয়ায় বারবার মোঙ্গল আক্রমণের শিকার হচ্ছিল। দেবগিরি অনেক দূরে হওয়ায় সেটি মোঙ্গলদের হাত থেকে বেশি নিরাপদ ছিল।
৯. মুহম্মদ বিন তুঘলকের ‘তামার মুদ্রার প্রচলন’ কেন ব্যর্থ হয়েছিল?
উত্তর: রুপোর ঘাটতি মেটানোর জন্য মুহম্মদ বিন তুঘলক সোনার বা রুপোর মুদ্রার বদলে একই মূল্যের তামার বা ব্রোঞ্জের মুদ্রা চালু করেন। কিন্তু এই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয় কারণ, মুদ্রা তৈরির ওপর সরকারের কোনো একচেটিয়া অধিকার বা বিশেষ সিলমোহর ছিল না। ফলে ঘরে ঘরে মানুষ নকল তামার মুদ্রা তৈরি করতে শুরু করে। বাজারে নকল মুদ্রায় ছেয়ে গেলে ব্যবসা-বাণিজ্য ভেঙে পড়ে এবং সুলতান বাধ্য হয়ে এই প্রকল্প প্রত্যাহার করেন।
১০. ‘ইকতা’ ব্যবস্থা বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: দিল্লি সুলতানির শাসকরা তাঁদের সাম্রাজ্যকে যে ছোটো ছোটো প্রদেশ বা প্রশাসনিক অঞ্চলে ভাগ করেছিলেন, সেগুলোকে ‘ইকতা’ বলা হতো। সুলতানরা তাঁদের সামরিক সেনাপতিদের বা রাজকর্মচারীদের নগদ বেতনের বদলে নির্দিষ্ট একটি করে ইকতা দান করতেন। এর বিনিময়ে সেই প্রাপককে ওই এলাকার রাজস্ব আদায় করতে হতো এবং সুলতানের জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক সৈন্য পালন করতে হতো।
১১. ‘ইকতাদার’ বা ‘মুকতি’ কাদের বলা হতো? তাঁদের প্রধান কাজ কী ছিল?
উত্তর: সুলতানের কাছ থেকে যাঁরা ইকতা পেতেন, তাঁদের ‘ইকতাদার’, ‘মুকতি’ বা ‘ওয়ালি’ বলা হতো।
কাজ: তাঁদের প্রধান কাজ ছিল নিজের ইকতার মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা, কৃষকদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করা এবং আদায় করা রাজস্ব থেকে নিজের ও সৈন্যদের খরচ মিটিয়ে উদ্বৃত্ত অর্থ (ফাওয়াজিল) সুলতানের রাজকোষে জমা দেওয়া। এছাড়া যুদ্ধের সময় সুলতানকে সৈন্য দিয়ে সাহায্য করাও তাঁদের দায়িত্ব ছিল।
১২. ‘উলেমা’ কাদের বলা হতো? রাজনীতিতে তাঁদের প্রভাব কেমন ছিল?
উত্তর: ‘উলেমা’ (বহুবচনে আলেম) বলতে ইসলামী ধর্মশাস্ত্রে এবং কোরআনে পণ্ডিত ব্যক্তিদের বোঝানো হতো।
প্রভাব: সুলতানি যুগে উলেমাদের বিরাট প্রভাব ছিল। তাঁরা সুলতানকে ধর্মীয় বিষয়ে উপদেশ দিতেন এবং ইসলামী আইন অনুযায়ী রাষ্ট্র চলছে কি না তা তদারকি করতেন। অনেক সময় তাঁরা সুলতানের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাজেও হস্তক্ষেপ করতেন।
১৩. পানিপথের প্রথম যুদ্ধ কবে, কাদের মধ্যে হয়েছিল? এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব কী?
উত্তর: পানিপথের প্রথম যুদ্ধ ১৫২৬ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লির শেষ সুলতান ইব্রাহিম লোদি এবং কাবুলের শাসক জহিরুদ্দিন মুহম্মদ বাবরের মধ্যে হয়েছিল।
গুরুত্ব: এই যুদ্ধে বাবর উন্নত যুদ্ধকৌশল এবং কামানের ব্যবহার করে ইব্রাহিম লোদিকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত ও নিহত করেন। এর ফলেই ভারতে ৩২০ বছরের পুরোনো দিল্লি সুলতানি সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে এবং মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপিত হয়।
১৪. সুলতানি আমলে ‘খলিফা’র অনুমোদন লাভ করা কেন জরুরি ছিল?
উত্তর: খলিফাকে সমগ্র মুসলিম জাহানের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রধান হিসেবে মান্য করা হতো। দিল্লির অনেক সুলতান (যেমন- ইলতুৎমিস, মুহম্মদ বিন তুঘলক) সিংহাসনে বসার পর খলিফার কাছ থেকে স্বীকৃতি বা অনুমোদনপত্র নিয়ে আসতেন। এর ফলে রাজ্যের সাধারণ মুসলিম প্রজারা এবং উলেমা গোষ্ঠী সেই সুলতানকে ঈশ্বরের আশীর্বাদপুষ্ট বৈধ শাসক বলে মনে করত এবং তাঁর বিরুদ্ধে সহজে কেউ বিদ্রোহ করতে সাহস পেত না।
১৫. আমির খসরু কে ছিলেন? তাঁকে ‘তুতি-ই-হিন্দ’ বা ‘ভারতের তোতাপাখি’ বলা হয় কেন?
উত্তর: আমির খসরু ছিলেন সুলতানি আমলের (বিশেষ করে আলাউদ্দিন খলজির সময়ের) একজন অত্যন্ত বিখ্যাত কবি, গায়ক এবং সুফি সাধক নিজামুদ্দিন আউলিয়ার শিষ্য।
কারণ: তিনি ফারসি ভাষায় চমৎকার সব কবিতা ও গান রচনা করতেন। পাশাপাশি তিনি ভারতীয় হিন্দুস্তানি সংগীতের সাথে ফারসি সুরের চমৎকার মিলন ঘটিয়েছিলেন। সেতার ও তবলার মতো বাদ্যযন্ত্রের আবিষ্কারকও তাঁকে বলা হয়। তাঁর এই অসাধারণ সুললিত কণ্ঠস্বর ও সাহিত্যকীর্তির জন্যই তাঁকে ‘তুতি-ই-হিন্দ’ বা ‘ভারতের তোতাপাখি’ বলা হয়।